গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’র ভবিষ্যৎ কী, কোন দল কী চায়

নিউজ ডেস্ক
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এর সঙ্গে যুক্ত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই গণভোট শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’— কোনটি জয়ী হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে সংস্কার প্রস্তাবগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা পাবে কি না। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কারগুলো জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট পাবে এবং যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সেই সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকতে হবে। বিপরীতে ‘না’ ভোট জয়ী হলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সমঝোতা ও দরকষাকষির অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক প্রধান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ সনদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ হবে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তার মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ ভূমিকা নিশ্চিত হলে একক সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে আসবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পুরোপুরি রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। জনগণ যদি এই সনদ প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা গণঅভ্যুত্থান ও মানুষের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার শামিল হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও ভিন্ন ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোট এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপি নীতিগতভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সমর্থন দিলেও শুরুতে সরাসরি প্রচারে নামেনি। পরে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভা থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানান। তবে বিএনপির কয়েকটি নির্বাচনী মিত্র ও বাম দলগুলো গণভোটের বিরোধিতা করছে বা নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে না। তার দাবি, এই গণভোট আয়োজনের আইনি এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। অন্যদিকে, সিপিবিসহ কয়েকটি বাম দল বলছে, সংবিধানে বর্তমানে গণভোটের বিধান না থাকায় এটি একটি অপ্রয়োজনীয় উদ্যোগ।

জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, নির্বাচন কমিশন গঠনের নতুন পদ্ধতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার, নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্য থেকে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যা চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে পরবর্তী ধাপে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের পথ খুলে যাবে। আর ‘না’ জয়ী হলে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না; তখন ভবিষ্যৎ সরকার ও সংসদের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে একমাত্র নিয়ামক।

সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোট কেবল একটি ভোটাভুটি নয়— এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে: কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ধারাতেই।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত