‘‘আমি কোনো যৌন শিকারি নই, তবে আমি একজন অপরাধী। একজন খুনির সঙ্গে যে রুটি চুরি করে, তার যতটুকু পার্থক্য—ঠিক তেমন।’’ ২০১১ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছিলেন কুখ্যাত ধনকুবের জেফ্রি এপস্টেইন।
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। ওই সময় তিনি জামিনের সুযোগ ছাড়াই যৌন পাচারের মামলায় বিচার শুরুর অপেক্ষায় কারাবন্দি ছিলেন। এর আগেও অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করেছিলেন তিনি এবং যুক্তরাষ্ট্রে যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে পরিচালিত একটি বিস্তৃত যৌন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ বিপুল ভোটে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ অনুমোদন করে। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করেন এবং বিচার বিভাগকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত দিনে কিছু নথি প্রকাশ পেলেও বড় একটি অংশ গোপনই থেকে যায়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও নথি প্রকাশ করা হয়, তবে পুরো নথি উন্মুক্ত হয়েছে কি না—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি নথিকে ‘বিস্তৃত অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও বিরোধী ডেমোক্র্যাটসহ অনেকে দাবি করছেন, অযৌক্তিকভাবে বহু নথি আড়াল রাখা হয়েছে। প্রকাশিত নথিগুলো এপস্টেইনের বিলাসবহুল জীবন ও ক্ষমতাধর মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছে।
নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে ডাল্টন স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ওয়াল স্ট্রিটে প্রবেশ করে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হন। তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ একসময় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করত। ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক ও নিউ মেক্সিকোতে তার ছিল প্রাসাদসম বাড়ি ও র্যাঞ্চ।
এই সম্পদের সুবাদে তিনি রাজনীতিক, সেলিব্রিটি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘দারুণ মানুষ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রেপ্তারের অনেক আগেই এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
এপস্টেইনের বন্ধুত্বের তালিকায় ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, অভিনেতা কেভিন স্পেসি, প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টাইনসহ অনেক পরিচিত মুখ। তবে এসব সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এপস্টেইন নিজের ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রাখতে চাইতেন।
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় এক কিশোরীর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। পুলিশের তদন্তে বহু ভুক্তভোগীর সন্ধান মেলে। ২০০৮ সালে প্রসিকিউশনের সঙ্গে বিতর্কিত এক সমঝোতার মাধ্যমে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এড়িয়ে যান এবং মাত্র ১৮ মাসের সাজা পান, যার বড় অংশই কাটান ‘ওয়ার্ক রিলিজ’ সুবিধায়।
এই সমঝোতাকে মার্কিন গণমাধ্যম ‘শতাব্দীর চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দেয়। পরে এই কেলেঙ্কারির জেরে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর পদত্যাগে বাধ্য হন। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এপস্টেইন নিজের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন এবং সমাজের উঁচু স্তরে চলাফেরা অব্যাহত রাখেন।
২০১৯ সালে আবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারে রাখা হয় তাকে। সেখানে বিচার শুরু হওয়ার আগেই রহস্যজনকভাবে তার মৃত্যু হয়, যা নিয়ে আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল আলোচনায় আসেন। ২০২১ সালে তিনি যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। আদালতে ম্যাক্সওয়েল স্বীকার করেন, এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
আইনগতভাবে অনেক অধ্যায় শেষ হলেও জেফ্রি এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ছায়া এখনো বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।