গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঞ্চল্য: জামায়াত-এনসিপির পিআর ভোট পরিকল্পনা ফাঁস

 ছবি:
ছবি:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা, ২৯ আগস্ট ২০২৫

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াত ও এনসিপি। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা জামায়াত যেন একপ্রকার ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মোড’ থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পতনের পর মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই জামায়াত-এনসিপি ঘনিষ্ঠ অন্তত ৪১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি একাধিক গোপন বৈঠক করেন। এই বৈঠকগুলো মূলত গুলশান-বনানীর প্রাইভেট অফিস এবং কূটনৈতিক এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল—প্রশাসনিক পদবণ্টন ও কৌশল নির্ধারণ।

প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ, মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, উচ্চ আদালত, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রো-ভিসি নিয়োগেও জামায়াত-এনসিপি ঘনিষ্ঠদের বসানোর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি টেন্ডার ও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি—শুধু রাজধানী নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও একটি “অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ চেইন” গড়ে তুলেছে জামায়াত ও এনসিপি, যাতে তাদের অনুমতি ছাড়া বড় কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।

সরাসরি নির্বাচনে সীমিত সম্ভাবনা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সরাসরি নির্বাচনকে ভয় পাচ্ছে জামায়াত ও এনসিপি। কারণ, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জামায়াতের ভোটব্যাংক কখনোই ১০–১২% এর বেশি হয়নি। এনসিপি যেহেতু নতুন দল, তাদের ভোটভিত্তি আরও সীমিত।

একটি সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, আজই যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, জামায়াত ৩–৪টির বেশি আসন জিততে পারবে না, আর এনসিপি সর্বোচ্চ ১–২টি আসন। ফলে সরাসরি নির্বাচনে তাদের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত।

পিআর পদ্ধতিতে ভরসা

এই বাস্তবতায় জামায়াত ও এনসিপি জোর দিচ্ছে Proportional Representation (পিআর) ভোট পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে সারাদেশের মোট ভোটশতাংশ অনুযায়ী আসন বণ্টন হয়।

উদাহরণস্বরূপ, ৩০০ আসনের নির্বাচনে কোনো দল সারাদেশে ১০% ভোট পেলে তারা প্রায় ৩০টি আসন পাবে, যদিও কোনো নির্দিষ্ট আসনে প্রথম না হলেও। জামায়াত-এনসিপির হিসাব, এভাবে তারা অন্তত ২০–২৫টি আসন নিশ্চিত করতে পারবে, যা সরাসরি নির্বাচনে অসম্ভব।

আন্তর্জাতিক তৎপরতা

গোয়েন্দা রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, গত এক মাসে জামায়াত-এনসিপি নেতারা অন্তত তিনবার বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের দূতাবাসে। এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল পিআর ভোটের দাবিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়।

এছাড়া দুবাই ও কুয়ালালামপুরে প্রবাসী পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করছে তারা। পিআর পদ্ধতিতে বাড়তি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে অর্থ বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে।

সমালোচকদের সতর্কবার্তা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এ কৌশল দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। যারা জনসমর্থন ছাড়াই প্রশাসন ও অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের মূল নীতি নির্ধারণেও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।

বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি আসলে “ভোট এড়ানোর কৌশল।” কারণ, এখনই নির্বাচন হলে প্রশাসন ও অর্থনীতিতে জামায়াত-এনসিপির তৈরি সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বে।

সবমিলিয়ে, জামায়াত-এনসিপির পিআর ভোট দাবি শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং তাদের গড়ে তোলা প্রশাসনিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি পরিকল্পনা বলেই দেখা হচ্ছে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত